“আর আমরা তোমাদের কে অবশ্যই পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের কে- “
(সুরা: আল-বাকারাহ্, আয়াত: ১৫৫)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, বিপদ-আপদ, দুঃখ কষ্ট আমাদের জীবনে আসবেই। এটা হতে পারে কাঙ্খিত কোন কিছু না পাওয়া, কারো খারাপ আচরণ, সম্পর্কের অনবতি, দূর্ঘটনা, অসুখ-বিসুখ, সম্পদের ক্ষতি, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ইত্যাদি। এ সময় আমাদের দুঃশ্চিন্তা, হতাশা, অবসাদগ্রস্থতা, মেজাজ খারাপ, খিটমিটে ভাব, অল্পতেই রেগে যাওয়া ইত্যাদির প্রবণতা বেড়ে যায়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরোটি হলো কলব( অন্তর/মন)।’ (বুখারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯-৪০, হাদিস: ৫০)।
মনে অশান্তি থাকলে আল্লাহ্র ইবাদত এবং দৈনন্দিন কাজ কর্মে অনেক ব্যাঘাত ঘটে। আমরা খুব অল্পতেই ধৈর্য্য হারা হয়ে যাই, রেগে যাই। বাচ্চা লালন-পালনে অনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন। নীচের পদক্ষেপ গুলো আমাদের এ ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হবে ইন শা আল্লাহ্। আমরা আমাদের সন্তানদেরও এগুলো শিক্ষা দিবো যাতে তারাও এগুলো প্রয়োগ করতে পারে।
এ সময় আমরা কি করতে পারি?

আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করে প্রথম থেকেই ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। অনেকে আর কোন উপায় না দেখে ধৈর্য্য ধারণ করে। সব সময় মনে রাখবো-
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্য্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা: বাকারাহ্, আয়াত : ১৫৩)

কোন বিপদে আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে ভাবতে হবে যে আল্লাহ্ এর চেয়ে খারাপ অবস্থা থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমি সুস্থ আছি, সম্মানের একটা জীবন আমার আছে। প্রতিটি বিপদই নিয়ামত নিয়ে আসে।

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। (সুরা ইনশিরাহ আয়াত: ৫)
আমরা সমস্যা/বিপদে পরলে শুধু সেই দিকেই ফোকাস করি। কিন্তু ঐটা ছাড়া আল্লাহ্ যে আমাকে অনেক নিয়ামত দিয়ে রেখেছেন সেটা খেয়াল করিনা। সেগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলে মনে প্রশান্তি আসবে, কষ্ট লাঘব হবে।

কাউকে দোষারোপ না করে চিন্তা করবো আল্লাহ্ চেয়েছেন বলেই এমনটি হয়েছে। এটা আমার ভাগ্যে লিখা ছিলো এবং আমার রিজিকেরই অংশ। কেউ যদি দোষী থেকে থাকে তার হিসাব আল্লাহ্র সাথে।

কষ্টের কারন যদি কোন ব্যক্তি হয় তবে তাকে পজেটিভ ভাবে দেখবো এবং তার দৃষ্টিকোন থেকে তার কোন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে সেটা চিন্তা করবো। যদি সে জালিম হয় তবে সেটা ভিন্ন কথা।

মুমিনের জীবনের প্রতিটি কষ্ট গুনাহ্ মাফের কারণ এবং সোয়াব বৃদ্ধির উপায়। সব কষ্টের বিনিময় আমরা আল্লাহ্র কাছে জান্নাত পাবার আশা রাখি। মনে রাখবো আল্লাহ্ তার বান্দাকে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না।
“আল্লাহ্ কষ্টের পর সুখ দেবেন” [সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব -০৭]

দুনিয়ার জীবন মুমিনের জন্য কারাগার স্বরুপ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “শাহওয়াত (কামনা-বাসনা, ভোগ-বিলাস) দ্বারা জাহান্নামকে ঢেকে রাখা হয়েছে, আর দুঃখ-কষ্ট দ্বারা জান্নাতকে ঢেকে রাখা হয়েছে।” [সহীহ বুখারী]
তাই যত বেশী আল্লাহ্র আদেশ নিষেধ মেনে চলা যায় তত বেশী আল্লাহ্র সাহায্য পাওয়া যায় এবং মনে প্রশান্তি আসে।

বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, কাজ সহজ হওয়া, হতাশা, দুঃশ্চিন্তার দোয়া গুলো বেশী বেশী পড়া।(হিসনুল মুসলিম বইয়ে আছে)

মনযোগ সহকারে কোরআন শুনলে এবং তিলাওয়াত করলে আল্লাহ্র অশেষ রহমত বর্ষিত হয়। মনে প্রশান্তি আসে এবং কষ্ট-যন্ত্রনা কমে যায়।

রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা। সিজদায় আল্লাহ্র কাছে মনের কথা বলা এবং দোয়া করা। রবের সাথে আমাদের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে মনের মধ্যে দুঃখ যন্ত্রণা শুরু হয়। তাই নির্জনে নিজের সব দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা রবের কাছে বলে মনের মধ্যে প্রশান্তি লাভ করার চেষ্টা করা।

বেশী বেশী আল্লাহর জিকির (আল্লাহ্কে স্মরণ করা, কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ সহ কোরআন পড়া, তাসবিহ্ পড়া, ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করা) করতে হবে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহ্র জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।’ (সুরা রা’দ : আয়াত ২৮)।

নির্ভরযোগ্য আলেমদের দারস শুনতে পারেন।

প্রতিটি কাজ করার পূর্বে যখন এটা মনে করবো যে এটা আল্লাহ্র সন্তোষ্টি অর্জনের জন্য করছি তাহলে আর স্ট্রেস লাগবে না।

বেশী বেশী দান-সাদাকা করতে পারেন। দান-সাকায় বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখ দূর হয়। অসহায়দের আর্থিক/মানসিক ভাবে সাহায্য করতে পারেন। কারো জন্য কিছু করতে পারলে মনে অনেক প্রশান্তি আসে। নিয়ত থাকতে হবে আল্লাহ্র সন্তোষ্টির জন্য করছি।

বেশী বেশী তওবা এবং ইস্তেগফার করা। নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে আল্লাহ্র কাছে কান্নাকাটি করা।

বেশী বেশী দুরূদে ইব্রাহীম পড়া।

প্রতিদিন ১০টার আগে ঘুমাতে যাবেন এবং খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন। ভোরে বারান্দায় যেয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন। এতে শরীর এবং মন দু’টোই ভাল থাকবে।

শখের কোন কাজ করতে পারেন যেটা করলে আপনার মনে আনন্দ লাগবে। যেমনঃ সেলাই করা, ছবি আঁকা, বই পড়া ইত্যাদি। মন ভাল থাকলে আল্লাহ্র ইবাদতের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজগুলো ভাল ভাবে করতে পারা যায়।

সপ্তাহে ৫ দিন শরীর চর্চা করার চেষ্টা করবেন। এতে করে কিছু হরমোন রিলিজ হয় যা আপনার মন ভাল রাখতে এবং স্ট্রেস ম্যানেজ করতে সহায়তা করে।

পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয় স্বজনদের সাথে সময় কাটান এবং তাদের সাথে পজেটিভ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তাদের মধ্যে যতটুকু ভাল গুণ আছে সেটুকুর জন্য তাদেরকে ভালবাসুন। তাদের খারাপ গুণগুলোর জন্য তাদেরকে পরামর্শ দিবেন। আমরা কেউই ১০০% না।

বাইরে ঘুরতে যেতে পারেন। চেষ্টা করবেন প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে।

ঘরেকে সুগন্ধিময় করতে পারেন। এতে মন ভালো থাকে।

পুষ্টিকর খাবার শরীর এবং মন দু’টোই সুস্থ রাখে।